এলজিবিটিকিউ মানুষের অধিকার: ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও রাষ্ট্রীয় আইনের শৃঙ্খল ভাঙার সময়
ইসলামি মূল্যবোধ ধর্মবিশ্বাসের জায়গায় ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা তাৎপর্যপূর্ণ, ইসলাম কখনো ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও যৌন পরিচয়ের মানুষের অধিকারের বিষয়েও নমনীয়।
বাংলাদেশে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায় সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয় নিয়েই নিজেদের অধিকার নিয়ে সীমিতভাবে বেঁচে থাকে। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থার বিপরীতে জীবন সম্পর্কে এক ধরনের ভয়, লজ্জা ও আশঙ্কা নিয়ে এ মানুষদের বেঁচে থাকতে হয়। ধর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থার অন্তরালে এখানে রয়েছে উগ্রবাদ, মৌলবাদ ও চরমপন্থা। যেখানে ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষদের প্রতি গোষ্ঠীর এ সদস্যরা আগ্রাসী, এখানে এদের হত্যাযজ্ঞ মনে করা হয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে এখানে ধর্ম-বর্ণ-মতবাদ ও যৌন পরিচয়ের সবকিছুকে স্বীকৃতি দিয়ে একসঙ্গে চলা। এখানে ধর্ম বাধা হিসেবে আসাটা একজন মানুষের নিজস্ব লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করে স্বাধীন জীবনযাপনে মানবাধিকারের প্রতিও অবমাননা।
বাংলাদেশে সমলিঙ্গের কিছু যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩৭৭-এর অধীনে। যেখানে রাষ্ট্রও ধর্মীয় এক অদৃশ্য মানদণ্ডের স্বীকৃতি প্রদান করে। কিন্তু এ আইন রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করে। একই সঙ্গে তৈরি করে নিরাপত্তাহীনতা। এমন আইন অবশ্যই বাতিলযোগ্য।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর তত্ত্বাবধানে ১১ দলীয় ইসলামী ঐক্যজোট অবস্থান করে নিয়েছে। এবং পবিত্র ধর্ম ইসলামকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্রবাদের উন্মাদনা ছড়িয়েছে বহুদূর এরই মধ্যে। কিন্তু ভিন্ন মতের মানুষের অধিকার হরণ করে, হত্যার মধ্য দিয়ে কি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব? জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো চরম প্রতিক্রিয়াশীল, যারা শুধুমাত্র ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে নিরীহ মানুষদের হত্যা করে।
উদাহরণ হিসেবে তুরস্কের কথাই ধরা যাক। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, যিনি এরই মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে খলিফাতুল মুসলিমিন। সেখানেও সমকামীদের অধিকার রক্ষায় তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর, এবং সেখানে তাদের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তুরস্ক সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডারদের অভয়ারণ্য।
ভালোবাসার কোনো সীমারেখা হতে পারে না। যৌনতার বিষয়টিও সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত। এ বিষয়ে ইসলাম কখনো বাধা হতে পারে না। একজন মুসলিম নারী হিসেবে তাদের সে অধিকারের প্রতি আমি সমর্থন পোষণ করি। প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব ভালোবাসা ও যৌনতা প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত।
রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধর্মীয় মূল্যবোধ সমন্বয়ে একটি রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এই সম্প্রদায়কে। বাঁধ ভাঙার আওয়াজে এ সম্প্রদায়কে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে রাষ্ট্র, ধর্মীয় কানুন ও মৌলবাদীদের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
