ধর্ম, রাজনীতি ও সহিংসতা: ইসলাম ও জঙ্গিবাদ কি একই ধর্মের অংশ?
প্রতীকী ছবি
নিরীহ মানুষের রক্ত মেখে কি বেহেশতে যাওয়া যায়?
আল-ইসলামু দীনুস সালাম—অর্থাৎ ইসলাম শান্তির ধর্ম। পবিত্র আসমানি কিতাব কোরআনের এ বাণীকে একজন মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করতে হয়। এ বিশ্বাস মৌলিক পার্থক্যের জায়গা স্পষ্ট করে। ইসলাম কখনোই ধর্মের নামে মৌলবাদ, উগ্রবাদ, চরমপন্থাকে সমর্থন করে না।
এখানে ব্যক্তিগত, সামষ্টিক কিংবা দর্শনের চেয়ে কোরআনের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামের নামে সহিংস উগ্রবাদ যে কোনোভাবেই ধর্মের শান্তির ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ-আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) এবং জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর মতো জঙ্গি সংগঠন সহিংসতার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজকে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। এবং এর পেছনে জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামের মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিয়ামক হিসেবে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। যেখানে একটি দেশের গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করে শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন স্পষ্ট।
কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। কিন্তু এ সরকারই বা কেন এদের প্রতি এতটা নমনীয়তা দেখাচ্ছে? এমন প্রশ্ন অন্য সব সাধারণ মানুষের মতো আমারও।
ইতিহাস কখনো কখনো কথা বলে, পুনরাবৃত্তিও হয়। ২০০১-২০০৬ সাল; প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায়। এরপরও একের পর এক ঘটনা আসতে থাকে বাংলাদেশের মানুষের সামনে। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে প্রায় ৫০০টি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে জঙ্গিবাদের ভয়াবহতার একটি বড় উদাহরণ।
সে সময় আজকের যিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর নেতৃত্বে আদালত-সংক্রান্ত নথিতে হাওয়া ভবনে বৈঠক এবং তারেক রহমানের সঙ্গে হুজি নেতাদের যোগাযোগের সত্যতা উঠে এসেছিল। এবং তিনি ছিলেন জঙ্গি হামলা মামলার অন্যতম আসামি। যিনি দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পলাতক ছিলেন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। আদালত তারেক রহমানকে জঙ্গিবাদের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
আজকের বাংলাদেশে একই অপশক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরালে। সেখানে দেশব্যাপী খলেমাখচিত সাদাকালো পতাকার মিছিল, খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে সহিংসতা, নতুন করে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা ও সম্প্রতি ১০ আগস্ট প্রকাশিত হওয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগ—বাংলাদেশে আল-কায়েদার ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে। এমন কিছু ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে শুধু আমি না, বহু ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যেখানে জঙ্গিবাদের মামলায় সরাসরি সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো মৌলবাদী ও উগ্রবাদী সংগঠনের নেতারা জাতীয় সংসদে পৌঁছে গেছে বিরোধী দলের অবস্থানে, সেখানে আগামীর বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থানের বার্তা স্পষ্ট ও আশঙ্কার।
ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যা, নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত করা, লেখক-বুদ্ধিজীবীর কণ্ঠরোধ কিংবা অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার হরণ কি কোনোভাবেই শান্তির ধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে?
উত্তর অবশ্যই না।
ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তির বিবেক ও নৈতিকতার বিষয় হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের আইন হতে হবে সকল নাগরিকের জন্য সমান। একজন মুসলমান যেমন তাঁর ধর্ম পালন করবেন, তেমনি একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নাস্তিক, সংশয়বাদী কিংবা ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষও নিজের জীবন ও বিশ্বাস নিয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রাখবেন।
ইসলামের নামে যে কোনো সহিংসতা, মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ইসলামবিদ্বেষ নয়। বরং ধর্মকে রাজনৈতিক সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে পৃথক রাখার একটি নাগরিক অবস্থান।
